Wednesday, January 3, 2018

বিবরণ ও ভামতী : মতপার্থক্য



বিবরণ ও ভামতী : মতপার্থক্য


ভারতীয় দর্শনগুলির মধ্যে অদ্বৈত বেদান্ত বা কেবলাদ্বৈত বেদান্ত সর্বাধিক চর্চিত। শঙ্করাচার্য প্রস্থানত্রয়ের অর্থাৎ উপনিষদ্, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং ব্রহ্মসূত্রের অদ্বৈতবেদান্ত অনুসারী ব্যাখ্যা করে দর্শনটির ভিত্তি সুদৃঢ় করেন এবং দর্শনের আলোচনাকে অন্য মাত্রা প্রদান করেন। শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্রভাষ্যের অর্থাৎ শারীরকমীমাংসাভাষ্যের অর্থকে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করেছেন পরবর্তী অদ্বৈতাচার্যরা। প্রসন্ন অথচ গম্ভীর এই শাঙ্করভাষ্যের তাৎপর্য নির্ধারণ করতে গিয়ে পরবর্তী আচার্যরা বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পরের সঙ্গে সহমত পোষণ করেননি। শাঙ্করমতকে অবিকৃত রেখে তাঁরা নিজের নিজের বুদ্ধি অনুযায়ী ব্যাখ্যাপ্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছেন। তাই আমরা বাচস্পতি মিশ্রের মত এবং প্রকাশাত্মযতির মতের কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করি। এই লেখাতে সেগুলিই তুলে ধরা হয়েছে।

শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্রভাষের ওপর বাচস্পতি মিশ্র ভামতী নামে একটি টীকা রচনা করেন। অপরদিকে শঙ্করাচার্যের প্রত্যক্ষ শিষ্য পদ্মপাদাচার্য ব্রহ্মসূত্রভাষ্যের ওপর পঞ্চপাদিকা নামক একটি টীকা রচনা করেন। পঞ্চপাদিকাটীকার ব্যাখ্যা হল পঞ্চপাদিকাবিবরণ, এই ব্যাখ্যা লিখেছেন প্রকাশাত্মযতি। সংক্ষেপে একে বিবরণ বলা হয়। নীচে ভামতীতে আলোচিত এবং বিবরণে আলোচিত মতসমূহের মধ্যে বৈসাদৃশ্যের স্থলগুলি তুলে ধরা হল।

বিবরণমত
ভামতীমত
1.   ব্রহ্মবিচারের প্রবর্তকবিধি হল শ্রবণবিধি।  
1.   ব্রহ্মবিচারের প্রবর্তকবিধি হল অধ্যয়নবিধি।
2.  কর্ম বিদ্যার সাধন।
2.  কর্ম বিবিদিষার সাধন।
3.  মন ইন্দ্রিয় নয়।
3.  মন হল ইন্দ্রিয়।
4.  শ্রবণ মনন ও নিদিধ্যাসনের মধ্যে শ্রবণ হল বিধেয়।
4.  শ্রবণ বিধেয় নয়।
5.  শ্রবণ হল অঙ্গী এবং মনন ও নিদিধ্যাসন হল অঙ্গ।
5.  নিদিধ্যাসন হল অঙ্গী, শ্রবণ ও মনন হল তার অঙ্গ।
6.  জীব হল অন্তঃকরণে প্রতিবিম্বিত চৈতন্য। তাই বিবরণের জীববিষয়ক মতবাদ হল প্রতিবিম্ববাদ।
6.  জীব হল অন্তঃকরণাবচ্ছিন্ন চৈতন্য। তাই ভামতীর জীববিষয়ক মতবাদ হল অবচ্ছেদবাদ।
7.  শুদ্ধ চৈতন্য হল অজ্ঞানের আশ্রয়।
7.  জীব হল অজ্ঞানের আশ্রয়।
8.  অজ্ঞান হল এক।
8.  অজ্ঞান অনেক।
9.  অখণ্ডাকার অন্তঃকরণবৃত্তির বিষয় হল শুদ্ধ ব্রহ্ম।
9.  অখণ্ডাকার অন্তঃকরণবৃত্তির বিষয় হল উপহিত ব্রহ্ম।
10. অধ্যয়নবিধির প্রয়োজন হল অক্ষরগ্রহণ।
10. অধ্যয়নবিধির প্রয়োজন হল অর্থজ্ঞান।
11. ভৌতিক পদার্থসমূহ হল পঞ্চীকৃত।
11. ভৌতিক পদার্থসমূহ হল ত্রিবৃত্কৃত।
12. সাদৃশ্য অধ্যাসের কারণ নয়।
12. সাদৃশ্য হল অধ্যাসের কারণ।
13. শব্দ থেকে অপরোক্ষ জ্ঞান হয়। বিবরণমতে মহাবাক্যগুলি থেকেই ব্রহ্মের অপরোক্ষানুভব হয়ে থাকে।
13. শব্দ থেকে পরোক্ষ জ্ঞান হয়।ভামতীকার মনে করেন মনের দ্বারা ব্রহ্মের অপরোক্ষানুভব হয়।
14. স্বাপ্নপ্রপঞ্চ অবিদ্যার পরিণাম।
14. স্বাপ্নপ্রপঞ্চ মন এর পরিণাম।
15. শ্রবণাদিতে নিয়মবিধি অঙ্গীকৃত হয়।
15. শ্রবণাদিতে বিধ্যভাব স্বীকার করা হয়।
16. মায়াবৃত্তির দ্বারা ব্রহ্মের সর্বজ্ঞত্ব।
16. স্বরূপচৈতন্যের দ্বারা ব্রহ্মের সর্বজ্ঞত্ব।
17. সাধনচতুষ্টয়ের মধ্যে অন্যতম হল নিত্যানিত্যবস্তুবিবেক।
17. সাধনচতুষ্টয়ের মধ্যে অন্যতম হল সত্যাসত্যবস্তুবিবেক।

উৎস
১. ধর্মরাজাধ্বরীন্দ্র. বেদান্তপরিভাষা (ভূমিকা). সম্পা. অনু. গজাননশাস্ত্রী মুসলগাঁবকর. বারাণসী: চৌখম্বা বিদ্যাভবন, ২০১০ (পুনর্মুদ্রণ).
২. ধর্মরাজাধ্বরীন্দ্র. বেদান্তপরিভাষা (ভূমিকা). সম্পা. অনু. পঞ্চানন ভট্টাচার্য. কলিকাতা,.
৩. লক্ষ্মীনৃসিংহ. আভোগঃ কল্পতরুব্যাখ্যা (ভূমিকা). সম্পা. রামশাস্ত্রী এবং সুব্রহ্মণ্যশাস্ত্রী. মাদ্রাস: GOML, ১৯৫৫.
৪. Shastri, SN. "Points of Differences Between Bhāmatī and Vivaraṇa." from Google.

বিবাহের প্রকারভেদ



বিবাহের প্রকারভেদ

 
ব্রাহ্মো দৈবস্তথৈবার্ষঃ প্রাজাপত্যস্তথাসুরঃ।
গান্ধর্বো রাক্ষসশ্চৈব পৈশাচশ্চাষ্টমো
ঽধমঃ।।

বিবাহ আট প্রকার – ব্রাহ্ম, দৈব, আর্ষ, প্রাজাপত্য, আসুর, গন্ধর্ব, রাক্ষস এবং পৈশাচ। এগুলির স্বরূপ নীচে আলোচিত হল – 

ব্রাহ্ম – কন্যাকে বস্ত্র দিয়ে আচ্ছাদন করে এবং (অলঙ্কার ইত্যাদির দ্বারা) সম্মানিত করে, বিদ্যা এবং সদাচারসম্পন্ন বরকে স্বয়ং আমন্ত্রণ করে কন্যাদান করা হলে তাকে ব্রাহ্ম বিবাহ বলে।
আচ্ছাদ্য চার্চযিত্বা চ শ্রুতশীলবতে স্বযম্।
আহূয দানং কন্যাযা ব্রাহ্মো ধর্মঃ প্রকীর্তিতঃ।।

দৈব – (জ্যোতিষ্টোমাদি যজ্ঞ আরম্ভ হলে) যজ্ঞে কর্মকর্তা পুরোহিতকে অলঙ্কৃত কন্যা দান হল দৈব বিবাহ।
যজ্ঞে তু বিততে সম্যগৃত্বিজে কর্ম কুর্বতে।
অলঙ্কৃত্য সুতাদানং দৈবং ধর্মং প্রচক্ষতে।।

আর্ষ – (যাগ প্রভৃতি অবশ্যকার্য ধর্মের জন্য) বরের কাছ থেকে এক জোড়া বা দুই জোড়া ষাঁড় গ্রহণ করে তাকে বিধি অনুসারে কন্যাপ্রদান করা হলে তা আর্ষ বিবাহ।
একং গোমিথুনং দ্বে বা বরাদাদায ধর্মতঃ।
কন্যাপ্রদানং বিধিবদ্ আর্ষো ধর্মঃ স উচ্যতে।।

প্রাজাপত্য – তোমরা উভয়ে গার্হস্থ্য ধর্মের আচরণ করবে – এই অনুরোধ করে যথাবিধি অলঙ্কার দ্বারা কন্যাকে বরের হাতে প্রদান হল প্রাজাপত্য বিবাহ।
সহৌভৌ চরতাং ধর্মমিতি বাচানুভাষ্য চ।
কন্যাপ্রদানমভ্যর্চ্য প্রাজাপত্যো বিধিঃ স্মৃতঃ।।

আসুর – (শাস্ত্রমতে নয়) স্বেচ্ছায় কন্যার পিতা প্রভৃতিকে এবং কন্যাকে ধনসম্পদ দিয়ে যে কন্যাগ্রহণ তাকে আসুর বিবাহ বলে।
জ্ঞাতিভ্যো দ্রবিণং দত্ত্বা কন্যাযৈ চৈব শক্তিতঃ।
কন্যাপ্রদানং স্বাচ্ছন্দ্যাদাসুরো ধর্ম উচ্যতে।।

গান্ধর্ব – কন্যা এবং বর উভয়ের পারস্পরিক অনুরাগবশতঃ যে মিলন হয় তাকে গান্ধর্ববিবাহ বলে। এই বিবাহ কামমূলক এবং মৈথুনের ইচ্ছায় সংঘটিত হয়।
ইচ্ছযান্যোন্যসংযোগঃ কন্যাযাশ্চ বরস্য চ।
গান্ধর্বঃ স তু বিজ্ঞেযো মৈথুন্যঃ কামসম্ভবঃ।।

রাক্ষস – (কন্যাপক্ষের লোকজনকে) হনন করে, তাদের অঙ্গচ্ছেদ করে, তাদের বাড়ি ভেঙে (‘বাঁচাও’ ইত্যাদি বলে) চীৎকার করতে থাকা এবং কাঁদতে থাকা কন্যাকে হরণ করে যে বিবাহ তা হল রাক্ষস বিবাহ।
হত্ত্বা ছিত্ত্বা চ ভিত্ত্বা চ ক্রোশন্তীং রুদতীং গৃহাৎ।
প্রসহ্য কন্যাহরণং রাক্ষসো বিধিরুচ্যতে।।

পৈশাচ – নিদ্রায় অভিভূত, মদ্যপানে বিহ্বল অথবা উন্মত্ত মহিলাকে নির্জনে গমন করা হল পৈশাচ বিবাহ। আট প্রকার বিবাহের মধ্যে এই বিবাহ অত্যন্ত পাপজনক।
সুপ্তাং মত্তাং প্রমত্তাং বা রহো যত্রোপগচ্ছতি।
স পাপিষ্ঠো বিবাহানাং পৈশাচশ্চাষ্টমো
ঽধমঃ।।